নিজস্ব প্রতিবেদক ;
‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ সুবিধা দেওয়ার জন্য ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দুটি চুক্তি এবং এ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) দুর্বল দিকগুলো খতিয়ে দেখছে সরকার। চুক্তি দুটিতে কী কী অসম শর্ত আছে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ (মোবক), পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ (পাবক)-সহ কয়েকটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি মূল্যায়ন করে মতামত দিতে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ঐসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও কিছু দুর্বল দিক চিহ্নিত করেছেন। তারা একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। সেখানে চুক্তির বেশকিছু অসম শর্ত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করছি। বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কী কী শর্ত আছে, তা খুঁজে দেখছি। এরই মধ্যে সেখানে দেশের স্বার্থবিরোধী বেশকিছু শর্ত পেয়েছি। এছাড়া আমরা বিভিন্ন সংস্থার মতামত নিচ্ছি।
তিনি বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়। এ অবস্থার মধ্যে দুটি চুক্তি এবং চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত এসওপি পর্যালোচনা করছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব চুক্তি ও এসপিও সংশোধন অথবা বাতিলের প্রস্তাব করা হবে কি না, এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সূত্র জানায়, সমুদ্র, নদী ও স্থলবন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চারটি চুক্তি, ৫টি এসওপি এবং ৮টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গেই তিনটি চুক্তি, চারটি সমঝোতা স্মারক ও তিনটি এসওপি রয়েছে। ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেওয়ার জন্য দুটি চুক্তি রয়েছে। চুক্তি দুটি হচ্ছে ‘উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি’ এবং ‘চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তি’।
এ দুটি চুক্তি বাস্তবায়নে দুটি এসওপি রয়েছে। চুক্তি দুটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ ও ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সই হয়। মূলত এ দুই চুক্তির আওতায় নদী ও সমুদ্রপথে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে এসে সড়কপথে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় পাঠানো হয়। এতে দেশটির সময় ও খরচ-দুইই কমে যায়।
চুক্তি দুটি সইয়ের সময়ে অভিযোগ ওঠে, নামমাত্র চার্জ ও ফির বিনিময়ে ভারতকে ঐ সুবিধা দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। বন্দর দুটিতে ভারতীয় জাহাজকে অগ্রাধিকারও দেওয়া হয়। তবে ১৯৭২ সালে সম্পাদিত বাংলাদেশ-ভারত অভ্যন্তরীণ নৌপথ অতিক্রমণ ও বাণিজ্য প্রটোকল (পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটি) বিষয়ে সরকার এ মুহূর্তে পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানায়, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ‘উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি’ এবং ‘চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারসংক্রান্ত চুক্তি’র কিছু অসম শর্ত খুঁজে বের করেছেন। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে তা উল্লেখও করেছেন।
এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তির আওতায় ভারতের পূর্ব বঙ্গোপসাগর উপকূলের সাতটি সমুদ্রবন্দর (চেন্নাই, বিশাখাপত্তম, কৃষ্ণপত্তম, কলকাতা, কাকিনাডা, হলদিয়া ও প্যারাদ্বীপ) থেকে বাংলাদেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর (চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা) ও চারটি নদীবন্দরে (খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, পানগাঁও ও আশুগঞ্জ) সরাসরি জাহাজ চলাচলের সুযোগ রয়েছে। এ চুক্তির আওতায় চলাচল করা জাহাজের বন্দর শুল্ক কমানো হয়েছে। বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো এবং পণ্য লোড-আনলোড দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়াসহ বেশকিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তিতে সবচেয়ে বড় যে অসম শর্ত চিহ্নিত করা হয়েছে তা হচ্ছে বড় আকৃতির জাহাজকে বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীপথে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া। এই এসওপির ৩.২ অনুচ্ছেদে ছয় হাজার গ্রসটনের জাহাজ চলাচল করতে পারবে বলে উল্লেখ রয়েছে। এসওপির ৪.২ অনুচ্ছেদে যেই চারটি রুটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ভারতের সাত সমুদ্রবন্দরের সর্বনিম্ন গভীরতা ৮ মিটার রয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের (মোংলা) সর্বনিম্ন গভীরতা সাড়ে ৮ মিটার এবং নদীবন্দরের ৪ মিটার রয়েছে। চার মিটার গভীরতার নদীবন্দরের সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ গ্রসটনের জাহাজ চলাচল করতে পারে। অথচ ঐ চুক্তির আওতায় ৬ হাজার গ্রসটনের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। সমুদ্রগামী জাহাজ আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের নিয়মের আওতায় এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলা জাহাজ বাংলাদেশ শিপিং অর্ডিন্যান্সের আওতায় চলাচলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ চুক্তিতে তা মানা হয় না। চুক্তির আওতায় চলা জাহাজকে ‘রিভার সি ভ্যাসেল’ (আরএসভি) কোড অনুসরণ করে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, নদীবন্দরে চলা জাহাজের আকার সর্বোচ্চ আড়াই হাজার গ্রসটন হওয়া উচিত। সমুদ্রবন্দরে আসা জাহাজ মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্সের আওতায় সনদায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে চুক্তির আওতায় বন্দরে আসা জাহাজের শুল্ক ও ফি যে হারে নেয়া হচ্ছে, তা বিদেশি অন্যান্য জাহাজের জন্য অসম আচরণ।
সূত্র আরো জানায়, ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার চুক্তি করা হয় ২০১৮ সালে। ঐ চুক্তির আওতায় ২০২০ সালে এমভি সামুদ্রা এবং ২০২২ সালে এমভি সেঁজুতি নামক জাহাজ বাংলাদেশে আসে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে এবং চলতি বছরের জুলাইয়ে ঢাকায় দুই দেশের নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকে এ চুক্তি সংশোধনে বেশকিছু প্রস্তাব দেয় দিল্লি। সেখানে চুক্তির আওতায় তৃতীয় দেশে বাণিজ্য সুবিধার সুযোগ চাওয়া হয়।
অর্থাৎ বাংলাদেশের রফতানি পণ্য ভারতের সমুদ্রবন্দর হয়ে বিভিন্ন দেশের গন্তব্যে যাবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট এবং কক্সবাজারকে এ চুক্তিতে ‘পোর্ট অব কল’ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এজন্য এ সংক্রান্ত এসওপি সংশোধনের খসড়াও পাঠিয়েছে দেশটি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব প্রস্তাব নেতিবাচক দৃষ্টিতে চিন্তা করছে বাংলাদেশ।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ায় শিগিরই ‘সি লাইন অব কমিউনিকেশনের’ মাধ্যমে ‘মেইন লাইন অপারেটরদের’ সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপ ও প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সমুদ্রবন্দরে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত হয়ে অন্য দেশে পণ্য রফতানি করা হলে যে সাপ্লাই চেইন রয়েছে, তা নষ্ট হবে এবং খরচ ও সময় দুই বাড়বে।
সামিট পোর্ট অ্যালায়েন্স ও কক্সবাজার বন্দরকে ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণার বিষয়ে ঐ কর্মকর্তারা জানান, অতিমাত্রায় পলি জমার কারণে কক্সবাজার চ্যানেলটি নৌযান চলাচল অনুপযোগী হওয়ায় সেখানে নদীবন্দর গড়ে ওঠেনি। সেটা কাস্টম বন্ডেড এলাকাও নয়। আর সামিট পোর্ট অ্যালায়েন্সকে পোর্ট অব কলভুক্ত করার বিষয়ে সরকারের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।