সংসদে চার ইসলামি দলের ২৪ জন আলেম, বদলাচ্ছে সমীকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছে ৯টি দল। এর মধ্যে চারটি ইসলামি দল মিলিয়ে মোট ৭২টি আসনে জয় পাওয়ায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপস্থিতি এবারের সংসদে বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।

স্বাধীনতার পর এই প্রথম একাধিক ইসলামি দলের প্রতিনিধিত্ব দেখা যাচ্ছে জাতীয় সংসদে। সংসদে ইসলামি ধারার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নির্বাচিত ৬৮ জন সাংসদের মধ্যে অন্তত ২০টি আসনে মাদ্রাসা শিক্ষিতরা জয়লাভ করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে দুটি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি করে আসন। তারা প্রত্যেকেই মাদ্রাসা থেকে কামিল (মাওলানা) পাশ করেছেন। ছোট দলগুলোর এই অর্জনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন।

নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি জয়ী হয়েছে ২০৯টিতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮টি আসন পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নতুন প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ছয়টি আসন।

ছোট ইসলামি দলের আসনভিত্তিক ফল:
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ‘রিকশা’ প্রতীকে ময়মনসিংহ-২ ও মাদারীপুর-১ আসনে জয়লাভ করেছে। খেলাফত মজলিস ‘দেয়ালঘড়ি’ প্রতীকে জয় পেয়েছে সিলেট-৫ আসনে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ‘হাতপাখা’ প্রতীকে জয়ী হয়েছে বরগুনা-১ আসনে।

মাদারীপুর-১ আসনে জয়ী প্রার্থী মাওলানা সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হন। ময়মনসিংহ-২ আসনে মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ ১ লাখ ৪৬ হাজার ২০২ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করেন। সিলেট-৫ আসনে নির্বাচিত হন মুফতি আবুল হাসান। বরগুনা-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. অলি উল্লাহ জয়লাভ করেন ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে।

এছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় রাজনৈতিক দল জামাত ইসলামী থেকে মাদ্রাসা পড়ুয়া আলেম সাংসদের মধ্যে অন্তত বিশ জন রয়েছে। তারা হলেন-
১. মাওলানা মুফতি মো. আমির হামজা (কুষ্টিয়া-৩)
২. মাওলানা আফজাল হোসেন (কুষ্টিয়া-৪)
৩. মাওলানা তাজ উদ্দীন খান (মেহেরপুর-১)
৪. মাওলানা নাজমল হুদা (মেহেরপুর-২)
৫. মাওলানা মোঃ আবুল কালাম আজাদ (খুলনা-৬)
৬. মাওলানা সালাহ উদ্দিন (গাজীপুর-৪)
৭. মাওলানা মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম (চট্টগ্রাম-১৬)
৮. ড. মাওলানা মোঃ কেরামত আলী (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১)
৯. মাওলানা মোঃ নূরুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩)
১০. মাওলানা মোঃ আবু তালিব (ঝিনাইদহ-৪)
১১. ড. মাওলানা মোঃ শফিকুল ইসলাম (পটুয়াখালী-২)
১২. ব্যারিস্টার মাওলানা মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (পাবনা-১)
১৩. মাওলানা মোঃ আব্দুল আলীম (বাগেরহাট-৪)
১৪. মাওলানা মুহাম্মাদ আজীজুর রহমান (যশোর-১)
১৫. হাফেজ মোঃ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ (শেরপুর-১)
১৬. মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক (সাতক্ষীরা-২)
১৭. মুহাদ্দিস হাফেজ মুহাঃ রবিউল বাশার (সাতক্ষীরা-৩)
১৮. মাওলানা মোঃ রফিকুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৪)
১৯. মাওলানা নুরুল আমিন (রংপুর-৬)
২০. আব্দুল করিম (গাইবান্ধা-২)

স্বাধীনতার পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে জামায়াত ছাড়া অন্য কোনো ইসলামি দল সংসদে প্রবেশ করতে পারেনি। এবার একাধিক ইসলামি দলের প্রতিনিধিত্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদে এই বৈচিত্র্য আইন প্রণয়ন, বিতর্ক ও বিরোধী রাজনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে।

ত্রয়োদশ সংসদে চার ইসলামি দলের অভিষেক এবং ২৪ জন আলেমের নির্বাচিত হওয়া দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং সংসদের আলোচনার ধরন ও রাজনৈতিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *