অর্থনীতি প্রতিবেদক :
- আমদানি শুল্ক কমানোর প্রভাব নেই বাজারে
- নানা অজুহাতে দাম বাড়ানোর অভিযোগ
- তেলের সঙ্গে কিনতে হয় অপ্রয়োজনীয় পণ্য
- তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর মুখে কুলুপ
রাজধানীর বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে বোতলজাত সয়াবিন তেল। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১-২ ও ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল। আর পাওয়া গেলেও নানা শর্তসহ বেশি দাম রাখা হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। রমজান মাসকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে অভিযোগ তাদের।
রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান মাসকে সামনে রেখে সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। তাদের কারসাজির কারণে তেল আমদানিতে সরকারের শুল্কছাড় কোনো কাজেই আসছে না। দিনদিন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে ভোজ্য তেলের বাজার।
সরকার ভোজ্যতেল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছে। এতে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম কমার কথা থাকলেও সেই চিত্র কোথাও নেই।
বিক্রেতাদের দাবি, ডিলারদের কাছে অর্ডার দিয়ে চাহিদার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার শুল্ক-কর কমালেও চাহিদা অনুযায়ী সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়েনি।
জানা গেছে, সরকার ভোজ্যতেল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছে। এতে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম কমার কথা থাকলেও সেই চিত্র কোথাও নেই।
খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেল দিচ্ছে না। দুই-একটি কোম্পানি তেল সরবরাহ করলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এভাবে কমিয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের রামগঞ্জ জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন বলেন, এমনিতেই বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট। এর মধ্যে যেসব কোম্পানি তেল সরবরাহ করছে তারাও নানা শর্ত দিচ্ছে। এছাড়া কম চাহিদাসম্পন্ন পণ্য কিনতে বাধ্য করছে কোম্পানিগুলো।
ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেল দিচ্ছে না। দুই-একটি কোম্পানি তেল সরবরাহ করলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এভাবে কমিয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
একই বাজারের ইউসুফ স্টোরের স্বত্বাধিকারী ইউসুফ জানান, শর্ত দিয়ে তেল বিক্রি করতে গেলে কাস্টমারের সঙ্গে আমাদের বাগ্মিতায় জড়াতে হয়। এতে ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হয়। আবার শর্তপূরণ না করলে কোম্পানিগুলো তেল দিচ্ছে না।
কারওয়ান বাজারে সয়াবিন কিনতে আসা কাকলী বেগম বলেন, বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে একটি ৫ লিটার তেলের বোতল নিয়েছি। দোকানদার বলছে আরো কিছু কেনার জন্য। এছাড়া তেলের মূল্য লেখা ৮১৮ টাকা, কিন্তু আমাকে ৮৫০ টাকা দিতে হয়েছে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বাজার আরো লাগামহীন হয়ে পড়বে।
পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের পাইকারি তেল বিক্রেতা ও আমদানিকারকরা জানান, পাইকারি বাজারে তেলের কোনো সংকট নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখীর অজুহাতে বড় বড় গ্রুপের মিল মালিকরা ঠিকমতো তেল সরবরাহ করছে না। সময়মতো তেলের সরবরাহ না থাকাই সংকটের প্রধান কারণ।
ব্যবসায়ীরা জানান, শর্ত দিয়ে তেল বিক্রি করতে গেলে কাস্টমারের সঙ্গে আমাদের বাগ্মিতায় জড়াতে হয়। এতে ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হয়। আবার শর্তপূরণ না করলে কোম্পানিগুলো তেল দিচ্ছে না।
তারা আরো জানান, গত চার মাস ধরে মেঘনা ও সিটি গ্রুপ ঠিকমতো সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে না। ৫ আগস্টের আগে সিটি ও মেঘনা গ্রুপের যে পাম অয়েল প্রতি মণের দাম ৪ হাজার ৭৫০ টাকা ছিল, বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে ৬ হাজার ৩০০ টাকায়।
তাদের মতে, এস আলম গ্রুপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় অনেকেই তেল সরবরাহ করেননি। ফলে তেলের দাম বেড়ে যায়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
সয়াবিন তেলের আমদানিকারক ও কমিশন এজেন্ট শ্যামল সাহা বলেন, পাইকারি বাজারে তেলের কোনো সংকট নেই। যে সংকট তৈরি হয়েছে তা মিল মালিকদের কারসাজি। আমাদের কোনো সিন্ডিকেট নেই।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ গোলাম মাওলা বলেন, মিল মালিকরা নানা অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছেন। ফলে আমরা যেভাবে মিল থেকে কিনছি, সেভাবেই বিক্রি করছি। অতিরিক্ত দাম রাখলে দোকানে সেটা ভোক্তা অধিকার দেখবেন। খোলা বাজারে তেলের সরবরাহ রয়েছে।
ক্রেতা বলেন, বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে একটি ৫ লিটার তেলের বোতল নিয়েছি। দোকানদার বলছে আরো কিছু কেনার জন্য। এছাড়া তেলের মূল্য লেখা ৮১৮ টাকা, কিন্তু আমাকে ৮৫০ টাকা দিতে হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়তি। এ অবস্থায় দেশেও ভোজ্য তেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।
টি কে গ্রুপের ডিলার মেসার্স শফিক ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুজ্জামান লিটন বলেছেন, বর্তমানে কোম্পানি চাহিদামতো তেল দিতে পারছে না। আগে দুই ট্রাক মাল এলে, এখন আসছে এক ট্রাক। ফলে আমরা ঠিকমতো সরবরাহ করতে পারছি না।
জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী মার্চে পবিত্র রমজান শুরু হবে। সেজন্য চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্যতেল আমদানির জন্য এখনই প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হবে। না হলে ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট সম্পর্কে সিটি গ্রুপের পরিচালক (কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। সরকার ১০ শতাংশ শুল্ক কমালেও উৎপাদন ব্যয় বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে গত ৫ ডিসেম্বর ট্যারিফ কমিশনকে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি।
গত চার মাস ধরে মেঘনা ও সিটি গ্রুপ ঠিকমতো সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে না। ৫ আগস্টের আগে সিটি ও মেঘনা গ্রুপের যে পাম অয়েল প্রতি মণের দাম ৪ হাজার ৭৫০ টাকা ছিল, বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে ৬ হাজার ৩০০ টাকায়। এস আলম গ্রুপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় অনেকেই তেল সরবরাহ করেননি। ফলে তেলের দাম বেড়ে যায়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি এফ এম নাজির হোসেইন বলেছেন, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে এখন দেশে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে যে তেল বিক্রি হচ্ছে তা আগে আমদানি করা। ভোক্তাদের জিম্মি করে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে।
দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুই দফায় আমদানি শুল্ককর কমিয়েছে সরকার। প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ও দ্বিতীয় দফায় ১৯ নভেম্বর শুল্ককর কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা হয়েছে। এতে প্রতি কেজি অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলে শুল্ককর কমেছে ১০ থেকে ১১ টাকা। কিন্তু বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। শুল্ককর কমানোর ফলে ভোজ্য তেলের আমদানি বাড়ার কথা, উল্টো আমদানি আরো কমেছে।