নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনুসের অধীনে কি মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে?’ শিরোনামে জার্মান মিডিয়া আউটলেট ডয়চে ভেলেতে (ডি ডব্লিউ) একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সাংবাদিক তাসমিয়া আহমেদ ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৪ এ লেখা প্রকাশ করেন।
নিবন্ধে, তাসমিয়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর আলোকে বাংলাদেশে কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, তাসমিয়া নিজেকে একজন মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেন।
তবে মানবাধিকার বিষয়ে তাসমিয়ার সাম্প্রতিক উদ্বেগ তার পূর্বের বিবৃতি এবং কর্মের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। কারণ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদিন আগেও তিনি আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এমন সময়ে তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন যখন আন্দোলনকারী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহিংস সংঘর্ষে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর বেশিরভাগই হয়েছিল পুলিশ এবং হাসিনাপন্থী ক্যাডারদের গুলিতে।
সবকিছু সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সেই সময় তাসমিয়া আন্দোলনকারীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং সরকারি ভবনগুলোতে হামলার নিন্দা করতেই ব্যস্ত ছিলেন।
একইদিন ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তাসমিয়া এই আন্দোলনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিএমএম কোর্ট, এসি ল্যান্ড অফিস, ডিসি অফিস, আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ইউএনওর বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় এবং সাংবাদিকদের ওপর অনেক অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের ঘটনা দেখেছি।
তিনি আরো বলেন, আমরা সাংবাদিকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে এবং সরকার যে তাদের সমস্ত দাবি পূরণ করতে প্রস্তুত তা জানাতে একটি মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেছি।
একটি গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য এই আন্দোলন করছে দাবি করে তিনি বলেছিলেন, এরা ছাত্র নয়। দেশের মাটিতে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ছাত্রদের আবেগকে কাজে লাগিয়েছে।
বান্দরবানে খ্রিস্টান ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১৭টি বাড়িতে বড়দিনের প্রাক্কালে আগুন দেওয়া হয়েছিল বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাসমিয়া এই ঘটনাটিকে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনার আমলের পুলিশ প্রধান বেনজির আহমেদের সমর্থকদের সঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি জমি নিয়ে বিবাদের ফলে আগুনের সূত্রপাত।
তাসমিয়ার আচরণ তার বস্তুনিষ্ঠতা এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার সম্পর্কিত তার সাম্প্রতিক দাবিগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ডেইলি আওয়ার টাইমের নির্বাহী সম্পাদক তাসমিয়া ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঠিক ২২ দিন পর ডয়চে ভেলেতে কাজ শুরু করেন।
ডি ডব্লিউ-এর জন্য লেখা তার প্রথম নিবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ: অন্তর্বর্তী সরকার কি নির্বাচন বিলম্বিত করছে?’ তার এই লেখাকে কটাক্ষ করে সেই সময় স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় মাধ্যমই বলে যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য যথেষ্ট সময় লাগবে।
গত ১৮ নভেম্বর, তাসমিয়া আহমেদ ডয়চে ভেলের জন্য ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনঃসূচনা কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?’ শিরোনামে আরেকটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এখানে শেখ হাসিনাকে একজন ঐশ্বরিক নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তাসমিয়া। প্রকৃত অর্থে যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পরপর তিনটি প্রহসনমূলক একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ধ্বংস করার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন।
তাসমিয়ার মতে, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের উন্নতির জন্য তার ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করেছেন। আজ আমরা যেখানে আছি সেখানে জাতিকে নিয়ে আসার জন্য তিনি সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা করেছেন। উন্নয়নের এ পর্যায়ে সরকার প্রধানের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শামিল। আমরা জাতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি। এখন তার কন্যার যোগ্য নেতৃত্বে আধুনিক বিশ্বে রূপান্তরিত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
তাসমিয়ার শেখ হাসিনাকে একজন নিঃস্বার্থ নেত্রী হিসেবে চিত্রিত করা এবং তার সরকারের রাজনৈতিক দমন পীড়নকে জাস্টিফাই করা তার বিশ্লেষণের বস্তুনিষ্ঠতা এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে মানবাধিকার প্রশ্নে তার অবস্থান নিয়েও সন্দেহ জাগায়।